অনেকেই আছেন, যাদের খিদে পেলেই মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে যায়। আবার কেউ দীর্ঘ সময় না খেয়েও স্বাভাবিক থাকেন। কেন এই পার্থক্য? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এর পেছনে শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নয়, বরং নিজের শরীরের সংকেত বোঝার ক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখে।
অনেক সময় দেখা যায়, একটি শিশু খেলায় এতটাই মগ্ন যে খিদে লাগার বিষয়টিই টের পাচ্ছে না। কিন্তু খাবারের সময় পেরিয়ে যেতেই হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। এমন অভিজ্ঞতা শুধু শিশুদের নয়, বড়দের জীবনেও প্রায়ই ঘটে। আমরা অনেকেই খিদে পেলে অস্থির, বিরক্ত বা রাগী হয়ে যাই। এই অবস্থাকেই ইংরেজিতে বলা হয় ‘হ্যাংরি’ অর্থাৎ হাঙ্গার এবং অ্যাংরি শব্দ দুটির সমন্বয়ে তৈরি একটি শব্দ।
২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে ‘হ্যাংরি’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত হলেও, খিদে কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন মেজাজকে প্রভাবিত করে এ নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে খুব কম হয়েছে। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিলস ক্রোয়েমার জানান, মনোবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষকদের একটি দল ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ওপর এক মাস ধরে গবেষণা চালায়। অংশগ্রহণকারীদের শরীরে কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর লাগানো হয়, যা সারাদিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। পাশাপাশি দিনে দুবার তাদের স্মার্টফোনে জানাতে বলা হয় তারা কতটা ক্ষুধার্ত এবং সেই মুহূর্তে তাদের মেজাজ কেমন।
গবেষণার ফল গবেষকদেরও অবাক করেছে। দেখা গেছে, শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলেই মানুষের মেজাজ খারাপ হয় না। বরং যখন কেউ নিজে অনুভব করেন যে তিনি ক্ষুধার্ত, তখনই বিরক্তি বা খিটখিটে ভাব বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ শরীরের শক্তির মাত্রা নয়, বরং সেই সংকেত আমরা কতটা সঠিকভাবে বুঝতে পারছি, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা নিজেদের শরীরের ভেতরের সংকেত যেমন খিদে, তৃষ্ণা বা ক্লান্তি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন, তাদের মেজাজ তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকে। খিদে লাগলে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস প্রথমে শরীরে শক্তির ঘাটতি শনাক্ত করে। এরপর মস্তিষ্কের ইনসুলা অংশ সেই সংকেতকে সচেতন অনুভূতিতে রূপ দেয়। এই অংশটি স্বাদ অনুভবের পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হঠাৎ মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। এমন অবস্থায় মানুষ অনেক সময় আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেন, এমনকি দ্রুত শক্তি পাওয়ার আশায় অস্বাস্থ্যকর খাবারও খেয়ে ফেলেন গবেষকদের মতে, শরীরের প্রয়োজনের প্রতি সচেতন থাকলে শুধু মানসিক শান্তিই বাড়ে না, দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও তা উপকারী।
চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিলস ক্রোয়েমার জানান, শিশুদের শরীর দ্রুত বেড়ে ওঠে। তাই তারা অনেক সময় খিদে বা তৃষ্ণার সংকেত ঠিকমতো বুঝতে পারে না। আবার খেলাধুলা বা অন্য কাজে এতটাই মনোযোগী থাকে যে খাবারের সময় পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি খেয়াল করে না। ফলে হঠাৎ করেই তারা কান্না বা রাগের মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এমনকি, ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ এবং মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগের কারণে অনেক প্রাপ্তবয়স্কও সময়মতো খাবার খেতে ভুলে যান। ফলে শরীরের শক্তি কমে গেলে আচমকাই বিরক্তি বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খিদে লাগলে মেজাজ কিছুটা বদলানো স্বাভাবিক। তবে নিজের শরীরের সংকেত সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হওয়া যায়, তত সহজে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই খিদে চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে ‘হ্যাংরি’ হওয়া এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
খুলনা গেজেট/রুএ

